তাঁত: এক তাঁতির উৎসবের লড়াই
- Saree Upokatha

- May 21, 2025
- 2 min read

সনাতন একজন গ্রামীণ তাঁতী। নিজের হাতে কাঠের তাঁত চালিয়ে শাড়ি বোনেন। পেশাটা কষ্টের, কিন্তু সনাতন জানে—এই তাঁতের শব্দেই তাঁর সংসার বাঁচে। সামনে দুর্গাপুজো। তাই দিন-রাত এক করে কাজ করছেন তিনি। কারণ, পুজোর আগেই শাড়িগুলি বুনে মহাজনের হাতে তুলে না দিতে পারলে মজুরি মিলবে না।
সনাতন মহাজনের দাদনে কাজ করেন—অর্থাৎ অগ্রিম টাকা নিয়ে পরে শাড়ি বুনে দেন। কাজ শেষ না হলে দেনাও শোধ হয় না।
তাঁর পরিবারে রয়েছেন বৃদ্ধ বাবা, যিনি সনাতনের বিশ্রামের সময় তাঁতে সাহায্য করেন; স্ত্রী, যিনি সারাদিন চরকায় সুতো কাটেন; আর একমাত্র কন্যা, যাকে মা চেয়েছিলেন একটি ভালো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াতে। কিন্তু অভাবের চাপে তাকে ভর্তি করতে হয়েছে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
সনাতনের ছোট্ট ইচ্ছেগুলো খুব সাধারণ—মেয়ের জন্য পুজোর জামা, বাবার জন্য একটি ধুতি, স্ত্রীর জন্য ছাপা শাড়ি। নিজের কথা কখনও ভাবেন না।
তবে এইবার, গোপনে নিজের হাতে একটি অতিরিক্ত শাড়ি বোনেন তিনি। কচি কলাপাতা রঙ, আঁচলে দারুণ নকশা। সেটি স্ত্রীর জন্য তুলে রাখেন—পুজোর একমাত্র চমক হিসেবে।
কিন্তু হঠাৎ একদিন মুষলধারে বৃষ্টি নামে। তাঁতের ঘরে জল ঢুকে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কয়েকদিন পর জল সরে গেলে আবার শুরু হয় হাড়ভাঙা খাটুনি। দিন-রাত এক করে সময়মতো বাকি শাড়িগুলো বুনে ফেলেন সনাতন।
মহালয়ার আগের দিন মহাজন আসেন শাড়ি নিতে। কিন্তু গোনাগুনিতে দেখা যায়, একখানা শাড়ি কম। সনাতনের স্ত্রীর জন্য যত্ন করে রাখা শাড়িটিও নিতে বাধ্য করেন মহাজন। সনাতনের চোখের সামনে থেকে তাঁর ভালোবাসা ছিনিয়ে নেওয়া হয়—নিঃশব্দে।
এরপর আসে মহাষষ্ঠী। মজুরি পাওয়ার আশায় মহাজনের কাছে যান সনাতন। মেয়েকে বলে যান—"তুমি তৈরি থেকো, নতুন জামা কিনে আনব।"
কিন্তু মহাজন জানান, কলকাতার দোকান থেকে এখনও টাকা পাননি। শাড়ির বদলে পেয়েছেন একটি ঠান্ডা মেশিন। তাই এই মুহূর্তে কাউকে মজুরি দিতে পারবেন না। "পুজোর পর টাকা পেলে দেব," বলেন তিনি।
সনাতন কিছু বলতে পারেন না। শুধু মাথা নিচু করে রাস্তায় নেমে আসেন। একহাতে তিনি ঝুলিয়ে রাখেন নিজের স্বপ্নভঙ্গ, অন্য হাতে টেনে চলেন জীবনের গ্লানি।
বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে চলে যান ফার্মের মাঠের দিকে। তাঁর মাথায় ঘোরে—এইভাবে আর কতদিন? মহাজনের দাদনে আটকে থেকে এই সংসার আর টানা যাবে না।
তিনি ভাবেন, যদি সমবায় তাঁত প্রকল্পে যোগ দেওয়া যেত! কিন্তু সেখানে সুযোগ পাওয়া খুব কঠিন। সরকারি হ্যান্ডলুম অফিসেও প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য—সাধারণ মানুষের ঢোকা সেখানে যেন নিষিদ্ধ।
তবু কিছু একটা করতেই হবে। মেয়ের চোখের দিকে তাকানোই কি যথেষ্ট কারণ নয়?
রাত হয়ে আসে। মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়বে—তার অপেক্ষাও আর থাকবে না। সনাতন জানেন, তাঁকেও ফিরতে হবে। কারণ পরের দিন আবার নতুন সূর্য উঠবে, আর তার সঙ্গে তাঁর লড়াইটাও চলবে—অবিরত, নিঃশব্দে।



Comments